সমুদ্রতরঙ্গের শ্রেণিবিভাগ :

সমুদ্র জলের উল্লম্বভাবে ওঠানামাকে এককথায় সমুদ্রতরঙ্গ বলে। প্রকৃতি, উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য অনুসারে সমুদ্রতরঙ্গকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়।

যথা — ক) অভিমুখ অনুসারে : অভিমুখ অনুসারে আবার সমুদ্রতরঙ্গকে প্রধানত ভাগে ভাগ করা হয়। যথা

i) সম্মুখতরঙ্গ বা সোয়াশ : সোয়াশ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হল সম্মুখ তরঙ্গ। সমুদ্র তরঙ্গ যখন উপকূলের দিকে এগিয়ে আসে এবং অগভীর সৈকত ভূমিতে আছড়ে পড়ে তাকে সম্মুখ তরঙ্গ বা সোয়াশ বলে। এই সময় তরঙ্গের বেগ কমে যাওয়ায় কিছু কিছু তরঙ্গ ফেনার আকারে আছড়ে পড়ে, এরূপ তরঙ্গকে সার্ফ বলে।

ii) প্রত্যাবর্তনকারী তরঙ্গ বা ব্যাকওয়াশ : ব্যাকওয়াশ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হল প্রত্যাবর্তনকারী তরঙ্গ। সোয়াশ বা সম্মুখ তরঙ্গ যখন ঢালু সৈকতের উপর দিয়ে পুনরায় সমুদ্রে ফিরে যায়, তাকে প্রত্যাবর্তনকারী তরঙ্গ বলে। উল্লেখ্য যে, এটি নীচের দিক দিয়ে যায় তাই একে অন্তঃতরঙ্গ বলে।

খ) কার্য অনুসারে : কার্য অনুসারে প্রধানত সমুদ্রতরঙ্গকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা —

i) গঠনকারী তরঙ্গ : সমুদ্রের যেসমস্ত উপকূল কিছুটা শান্ত প্রকৃতির সেখানেই সমুদ্র তরঙ্গ বাহিত নুঁড়ি, কাঁকর, বালি, পলি সঞ্চিত হয়ে প্রশস্ত উপকূল গঠন করে। সেই তরঙ্গকে গঠনকারী তরঙ্গ বলে। উল্লেখ্য যে ব্যাকওয়াশের তুলনায় সোয়াশ শক্তিশালী হলে সেই উপকূল প্রশস্ত হয়।

ii) বিনাশকারী তরঙ্গ : যে সকল তরঙ্গ ফিরে যাওয়ার সময় উপকূলের প্রচণ্ড ক্ষয়ক্ষতি করে, তাকে বিনাশকারী তরঙ্গ বলে। উল্লেখ্য যে সোয়াশের তুলনায় ব্যাকওয়াশ শক্তিশালী হলে এরূপ তরঙ্গের সৃষ্টি হয়।

গ) অবস্থান অনুসারে : অবস্থান অনুসারে সমুদ্রতরঙ্গ দুই প্রকার। যথা —

i) অনুপ্রস্থ তরঙ্গ : প্রবল বায়ুপ্রবাহের প্রভাবে সমুদ্রতরঙ্গ যখন একই স্থানে ওঠানামা করে, তাকে অনুপ্রস্থ তরঙ্গ বলে। উল্লেখ্য যে গভীর সমুদ্রে এরূপ তরঙ্গ দেখা যায়।

ii) অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ : উপকূলের নিকটে তরঙ্গগুলি পার্শ্ববর্তী অংশে বেশি সঞ্চালিত হয়। একে অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ বলে।

সামুদ্রিক ক্ষয়ের পদ্ধতিসমূহ ও উর্মিভঙ্গ (breakers) :

সমুদ্রতরঙ্গ প্রধানত পাঁচটি পদ্ধতিতে উপকূলভাগ ক্ষয় করে। এগুলি হল দ্রবণ ক্ষয়, জলপ্রবাহ ক্ষয়, অবঘর্ষ ক্ষয়, ঘর্ষণ ক্ষয় এবং বুদ্‌বুদ ক্ষয়।

দ্রবণ ক্ষয় : বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত সমুদ্রের জলের সংস্পর্শে চুনাপাথর, ডলোমাইট, চক্‌ দিয়ে গঠিত উকূলভাগ দ্রবীভূত ক্ষয় হয়।

জলপ্রবাহ ক্ষয় : সমুদ্রতরঙ্গ বায়ুপ্রবাহের প্রভাবে প্রবল বেগে উপকূলে আঘাত করে। এর ফলে উপকূল ভাগ ক্ষয় হয়। একে জলপ্রবাহ ক্ষয় বলে।

অবঘর্ষ ক্ষয় : সমুদ্রতরঙ্গে আঘাতে উপকূলের বড়ো বড়ো প্রস্তর খণ্ডগুলি পরস্পরের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে ছোটো ছোটো প্রস্তরখণ্ডে পরিণত হলে তাকে ঘর্ষণ ক্ষয় বলে।

বুদ্‌বুদ ক্ষয় : তরঙ্গের জল উপকূলের ফাটলযুক্ত শিলার মধ্যে প্রবেশে ক্ষয় ও ফাটলের মধ্যে বুদ্‌বুদ সৃষ্টি করে বেরিয়ে আসে। বুদবুদের আঘাতে ফাটল প্রসারিত হয় এবং কালক্রমে শিলাকে ভেঙ্গে দেয়।

উর্মিভঙ্গ : সমুদ্রতরঙ্গ বা ঢেউ­এর উৎপত্তিস্থল হল মাঝসমুদ্র। এই তরঙ্গ উপকূলের দিকে যত অগ্রসর হয় ততই জলের গভীরতা হ্রাস পায়। ফলে তরঙ্গগুলির তলদেশের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে কুণ্ডলী আকারে ভেঙ্গে পড়ে। একে উর্মিভঙ্গ বলে।

সমুদ্রতরঙ্গের ক্ষয়কার্যের প্রক্রিয়াসমূহ :

সমুদ্রতরঙ্গের আঘাতে শিলাস্তর ক্ষয়ে যায়। সমুদ্র তরঙ্গ নিম্নলিখিত প্রক্রিয়ায় উপকূল ক্ষয়প্রাপ্ত করে।

(i) অবঘর্ষ ক্ষয় (Corrosion) : প্রচণ্ড গতিতে বায়ুপ্রবাহিত হলে সমুদ্রতরঙ্গের জলরাশি উপকূলের বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়। তরঙ্গের সাথে ভেসে আসা নুড়ি, বালি, কাঁকরের আঘাতে উপকূলভাগের তটভূমি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে মসৃণ হয় ও ভৃগুতটে খাঁজের সৃষ্টি হয়।

(ii) ঘর্ষণ ক্ষয় (Attrition) : সমুদ্র তরঙ্গের বিভিন্ন আকৃতির পাথর বা শিলাখণ্ডগুলি পরস্পরের সঙ্গে ঠোকাঠুকি খেয়ে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে বালুকণায় পরিণত হয়। একে ঘর্ষণ ক্ষয় বলে।

(iii) তরঙ্গের আঘাতে ক্ষয় : (ক) জলপ্রবাহের গতিশক্তির মাধ্যমে ক্ষয় : ঝড়ের সময় সমুদ্রতরঙ্গ প্রবল বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে প্রচণ্ড বেগে উপকূলে আছড়ে পড়ে, উপকূলভাগের দুর্বল ও কোমল শিলাকে ভেঙে দেয়।

(খ) আকস্মিক আঘাতজনিত ক্ষয় : উপকূলের শিলায় ফাটল থাকলে ফাটলের ভিতরের বায়ু সমুদ্র তরঙ্গের আঘাতে বারবার সঙ্কুচিত­প্রসারিত হয়ে ফাটলগুলিকে প্রসারিত করে, শিলাস্তর প্রচণ্ড অভিঘাতের চাপে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ছোটো ছোটো পাথরের টুকরোয় পরিণত হয়।

(গ) ক্যাপোটিস­এর মাধ্যমে ক্ষয় : উপকূল গভীর হলে সমুদ্রতরঙ্গ না ভেঙে উপকূলের দিকে এগিয়ে যায় এবং ভৃগুতটে প্রতিহত হয়ে পুনরায় প্রত্যাবর্তনকারী তরঙ্গরূপে সমুদ্রে ফিরে আসে। এই প্রত্যাবর্তনকারী তরঙ্গ যেখানে সম্মুখ তরঙ্গের সঙ্গে মিলিত হয় সেখানে দুই বিপরীতমুখী তরঙ্গের মাধ্যমে এক প্রকার দণ্ডায়মান ও স্থানু তরঙ্গের সৃষ্টি হয়। একে ক্ল্যাপোটিস বলে। ক্ল্যাপোটিসের জলরাশি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ওঠানামা করার ফলে পর্যায়ক্রমে যে চাপের হ্রাস­বৃদ্ধি ঘটে, তার প্রভাবে নীচের শিলাস্তরে ক্রমশ আলগা হয়ে উৎপাটিত ও অপসারিত হয়।

iv) দ্রবণ ক্ষয় : শিলাগঠনকারী খনিজ পদার্থ সমুদ্রজলে দ্রবীভূত হয়ে যায়। যেমন উপকূলভাগ চুন, চক, ডলোমাইট দ্বারা গঠিত হলে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উপকূলভাগ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, একে বলে দ্রবণক্ষয়।

সমুদ্রতরঙ্গের ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপসমূহ :  

উপকূল অঞ্চলে সমুদ্রতরঙ্গের ক্ষয়কার্যের ফলে নানা ধরনের ভূমিরূপ সৃষ্টি করে—

i) ভৃগু (Cliff) : কোমল শিলা দিয়ে গঠিত খাড়া উপকূলবাগ দীর্ঘদিন ধরে ক্রমাগত সমুদ্রতরঙ্গের আঘাতে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ভৃগু সৃষ্টি করে। ক্ষয়ের ফলে খাড়া উপকূলভাগে একটি খাঁজের সৃষ্টি হয়। এই খাঁজ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলে স্থলভাগের ওপরের অংশটি সমুদ্রের দিকে ঝুঁকে অবস্থান করে। এইরূপ ভূভাগকে ভৃগু বলে। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমের ডলফিন নোজ এর উদাহরণ।

ii) তরঙ্গ কর্ষিত মঞ্চ (Wave Cut Bench) : সমুদ্রতরঙ্গের আঘাতে উপকূলের ভৃগু ক্ষয় পেয়ে যতই পশ্চাদপসরণ করে ততই একটি মঞ্চের ন্যায় মৃদু ঢালযুক্ত সমতল পৃষ্ঠের সৃষ্টি করে। একে তরঙ্গকর্তিত মঞ্চ বলে। অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায় তরঙ্গকর্তিত মঞ্চ মসৃণ হয়।

iii) সমুদ্র গুহা (Sea cave) : কঠিন শিলাস্তরে গঠিত ভৃঘুর মধ্যে যদি কোনো দুর্বল স্থান থাকে তবে সেই স্থানে সামুদ্রিক ক্ষয়ের ফলে যে গর্ত বা সুড়ঙ্গের সৃষ্টি হয় তাকে গুহা বলে। যেমন — স্কটল্যাণ্ডের স্ট্যাকা দ্বীপের ফিঙ্গলস্‌ কেভ।

iv) ব্লো হোল (Blow-hole) : সমুদ্রতরঙ্গের আঘাতে সৃষ্ট গুহাগুলি ক্রমাগত ক্ষয়ের ফলে আরো প্রসারিত ও গভীর হয় এবং পরবর্তী সময়ে গুহার ছাদ উন্মুক্ত হয়ে যায়। এর ফলে সমুদ্রতরঙ্গের জল ও বাতাস গুহাগুলির মধ্যে দিয়ে ছিটকে ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে আসে। এইরূপ গর্তগুলিকে ব্লো হোল বলা হয়। স্কটল্যাণ্ডের উপকূলে ব্লো হোল দেখা যায়।

v) গিও বা জিও (Geo) : ক্রমাগত সমুদ্রতরঙ্গের আঘাতে ব্লো হোলের গর্ত ক্রমশ বৃদ্ধি পায় এবং একমসয় গুহার ছাদ ধসে পড়ে। এর ফলে দীর্ঘ ও সংকীর্ণ খাঁড়ির সৃষ্টি করে। একে স্কটল্যাণ্ড ও ফ্যারো দ্বীপে গিও বা জিও বলে।

vi) স্ট্যাক ও স্ট্যাম্প :ক্রমাগত প্রবল সমুদ্রতঙ্গের আঘাতে স্বাভাবিক সমুদ্র খিলানের মাথা ভেঙ্গে শিলাস্তর খাড়াভাবে স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। এদের সামুদ্রিক স্তম্ভ বা স্ট্যাক বলে। গোয়ার উপকূলে স্ট্যাক দেখা যায়।

স্ট্যাক ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ছোটো হয়ে সমুদ্রতলের উচ্চতায় অবস্থান করলে তাকে স্ট্যাম্প বলে। এগুলি কেবলমাত্র ভাটার সময় দেখা যায়।

vii) সামুদ্রিক খিলান : সমুদ্রের দিকে অভিক্ষিপ্ত সংকীর্ণ স্থলভাগ ক্ষয়ের ফলে ছোটো সেতু বা ব্রিজ­এর আকৃতি ধারণ করলে তাকে সামুদ্রিক খিলান বলে।

সমুদ্রতরঙ্গের সঞ্চয়ের ফলে গঠিত ভূমিরূপসমূহ :

সমুদ্র তরঙ্গের ক্ষয়কার্যের ফলে যেমন নানা ধরনের ভূমিরূপ গড়ে ওঠে তেমনিভাবে সমুদ্র তরঙ্গের সঞ্চয়ের ফলে উপকূল অঞ্চলে নানা ধরনের বাঁধ তথা ভূমিরূপ গড়ে উঠতে দেখা যায়,  যেমন

বাঁধ : উপকূলের সমান্তরালে বা অর্ধচন্দ্রাকারে বালি, নুড়ি ইত্যাদি সঞ্চিত হয়ে যে চড়ার সৃষ্টি হয় তাকে বাঁধ বলে। অবস্থান ও আকৃতি অনুসারে বাঁধ নানা রকমের হয়।   যেমন—

i) পুরোদেশীয় বাঁধ : উপকূল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কিন্তু উপকূলের সমান্তরালে সমুদ্রতরঙ্গ বাহিত নুড়ি, কাঁকড়, বালি, পলি, কাদা সঞ্চিত হয়ে যে বাঁধ গড়ে ওঠে তাকে পুরোদেশীয় বাঁধ বলে। এই ধরনের বাঁধের পিছনে জল আংশিক আবদ্ধ হয়ে উপহ্রদের সৃষ্টি হয়। যেমন ভারতের কোরালায় এই বাঁধ দেখা যায়।

ii) তটদেশীয় বাঁধ : সমুদ্র উপকূল থেকে কিছুটা দূরে সমুদ্র তরঙ্গ বাহিত নানা রকম পদার্থ সঞ্চিত হয়ে স্বল্প উচ্চতা সম্পন্ন যে বাঁধের সৃষ্টি হয় বা সৃষ্টি করে, তাকে তটদেশীয় বাঁধ বলে। উল্লেখ্য যে এই বাঁধগুলি জোয়ারের জলের সময় নিমজ্জিত হয়ে যায়।

iii) প্রতিবন্ধক দ্বীপ : পুরদেশীয় বাঁধ উপহ্রদ দ্বারা উপকূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সমুদ্র তলের উপর স্থায়ীভাবে অবস্থান করলে, তাকে প্রতিবন্ধক দ্বীপ বলে।

iv) বার্ম : ঝটিকা তরঙ্গের মাধ্যমে আসা নুড়ি, বালি প্রভৃতি সম্মুখ তটভূমি এবং পশ্চাৎ তটভূমির সংযোগ স্থলে সঞ্চিত হয়ে সমুদ্রউপকূলের সমান্তরালে প্রায় অনুভূমিক শিরার মতো স্বল্পোচ্চভূমি গঠন করে, একে বার্ম বলে।

v) টম্বোলো : মূল ভূখণ্ড এবং তার নিকটবর্তী দ্বীপ যদি নুড়ি, কাঁকর, পলি দ্বারা গঠিত হয়ে বাঁধের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তাকে টম্বোলো বলে।

যেমনভারতের তুতিকোরিন সৈকত টম্বোলো দ্বারা যুক্ত হয়েছে।

vi) স্পিট : স্পিট হল বিশেষ এক প্রকার সামুদ্রিক বাঁধ। কখনো কখনো তরঙ্গবাহিত নুড়ি, কাঁকর, বালি, পলি, কাদা মূল ভূখণ্ডের দিক থেকে সঞ্চিত হয়ে সমুদ্রের দিকে অভিক্ষিপ্ত হয়, তাকে স্পিট বলে। স্পিটের অগ্রভাগ বর্শির কাঁটার মতো বেঁকে গেলে তাকে হুক বলে।

vii) যৌগিক কাস্পেট স্পিট বা কাস্পেট  ফোরল্যাণ্ড : পরস্পর সমান্তরালে অবস্থিত কয়েকটি স্পিট মিলে যদি ত্রিকোনাকার ভূখণ্ড বা অন্তরীপ গঠিত হয়, তাকে কাস্পেট ফোরল্যাণ্ড বলে। যেমন — হ্যাটেরাস অন্তরীপ।

viii) লবণাক্ত জলাভূমি : সমুদ্র উপকূলের বাঁধ ও স্পিটের পিছনে পলি কাদার সঞ্চয় হয়ে কর্দমাক্ত সমভূমির সৃষ্টি হয়। একে জার্মানিতে ভাটেন বলে।

ix) উপকূলীয় বালিয়াড়ি : অনেক সময় সৈকতভূমিতে বালি সঞ্চিত হয়ে বালিয়াড়ি গঠিত হয়। ওড়িশা ও দীঘা উপকূলে এইরূপ বালিয়াড়ি দেখা যায়।

x) সৈকত বা বেলাভূমি : সমুদ্র উপকূলে তরঙ্গ দ্বারা বাহিত নুড়ি, কাঁকড়, বালি, পলি ইত্যাদি পদার্থ সঞ্চিত হয়। ফলে উপকূল থেকে সমুদ্রের দিকে এক ঈষৎ ঢালু ভূমিরূপ গঠিত হয়। যাকে সৈকত বা বেলাভূমি বলে। যেমনদীঘা, গোয়া ইত্যাদি অংশে এইরূপ ভূমিরূপ দেখা যায়।

xi) উপসাগর : মহাসাগরের পার্শ্ববর্তী উপকূল অঞ্চলে সামুদ্রিক সঞ্চয়ের দ্বারা তিন দিক স্থল বেষ্টিত এবং একদিক সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত যে বৃহৎ জলভাগের সৃষ্টি হয়, তাকে উপসাগর বলে।

উপরিউক্ত ভূমিরপগুলি ছাড়াও সমুদ্রতরঙ্গের সঞ্চয়কার্যের ফলে উপহ্রদ, অ্যাটল, ফ্যারস, পিনাকলস্ইত্যাদি গড়ে উঠতে দেখা যায়।

ধ্বংসাত্মক তরঙ্গ ও গঠনমূলক তরঙ্গ :

সমুদ্রবক্ষে সবসময় প্রবল বেগে বায়ু প্রবাহিত হয় ফলে সমুদ্রে তরঙ্গের সৃষ্টি হলে ঝড় বা তুষারপাতের সময় সমুদ্রের ঢেউ খুব উঁচু হয়ে শক্তিশালী হয় এবং উপকূলে এসে প্রবল বেগে আঘাত করে ক্ষয় করতে থাকে। ওই ক্ষতের ঢাল বরাবর পুনরায় সমুদ্রে ফিরে যায়। এই সব তরঙ্গই ধ্বংসাত্মক বা বিনাশকারী তরঙ্গ।

এই তরঙ্গের শক্তি অধিক থাকায় ক্ষয়প্রাপ্ত দ্রব্যগুলি সৈকতে বা উপকূলে সঞ্চিত হয়ে দূর সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হয়। বিনাশ তরঙ্গ অপেক্ষা ব্যাকওয়ান অধিক শক্তিশালী। ভূমিভঙ্গের পর তরঙ্গ প্রতি মিনিটে 15-20 বার তীরভূমিতে আছড়ে পড়লে বিনাশকারী তরঙ্গে পরিণত হয়। অপেক্ষাকৃত শান্ত তরঙ্গগুলি যে শক্তিতে সমুদ্র উপকূলে আঘাত করে তাতে কাঁকর, বালি প্রভৃতি কেবল তীরভূমিতে সঞ্চিত হয়। এই জাতীয় তরঙ্গগুলিকে গঠনমূলক তরঙ্গ বলে।

তরঙ্গের প্রবাহে ক্ষয়জাত পদার্থগুলি সঞ্চিত হওয়ায় উপকূলভাগ প্রশস্ত হয়। এক্ষেত্রে সোয়নে ব্যাকওয়ান অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী ভূমিভঙ্গের পর 1 মিটার উঁচু তরঙ্গ প্রতি মিটার 5-8 বার তীরে এসে পৌঁছালে উপকূলভাগ গঠিত হয়। 

 

সমুদ্রতরঙ্গ ও সমুদ্রস্রোতের মধ্যে পার্থক্য :  

বিষয়

সমুদ্রতরঙ্গ

সমুদ্রস্রোত

প্রকৃতি সমুদ্রতরঙ্গে জলরাশি একই স্থানে অবস্থান করে বৃত্তাকারে ওঠানামা করে। সমুদ্রস্রোতের মাধ্যমে জলরাশি অনুভূমিকভাবে একটি নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত হয়।
উপকূলের ওপর প্রভাব সমুদ্রতরঙ্গ ক্ষয় ও সঞ্চয় কার্যের মাধ্যমে উপকূলে ভূমিরূপ সৃষ্টি করে ও পরিবর্তন ঘটায়। সমুদ্রস্রোত উপকূলের সমান্তরালে প্রবাহিত হওয়ায় উপকূলের বিশেষ কোনো ভৌত পরিবর্তন ঘটায় না।
জলবায়ুর ওপর প্রভাব সমুদ্র তরঙ্গ উপকূলের জলবায়ুতে বিশেষ কোনো প্রভাব ফেলে না। সমুদ্রস্রোত উপকূলের জলবায়ুকে প্রভাবিত করে।
নিয়ন্ত্রক বায়ুপ্রবাহের গতিবেগ, ফেচ, ভূমিকম্প, সুনামি সমুদ্র তরঙ্গের গতিপ্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। নিয়তবায়ু প্রবাহ, উপকূলের আকৃতি, সমুদ্রজলের লবণতা ও উষ্ণতার প্রকৃতি সমুদ্র স্রোতের গতি প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

  

প্রবাল প্রাচীর গঠনে অনুকূল অবস্থা বা শর্তসমূহ :

জলের উষ্ণতা : প্রবাল প্রাচীর গঠনের অনুকূল অবস্থা বলতে জলের উষ্ণতা অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রবাল কীট প্রচণ্ড উত্তাপ বা প্রচণ্ড শীতলতা সহ্য করতে পারে না। এরা সাধারণত 20°-21°C উষ্ণতায় বৃদ্ধি পায়।

সমুদ্র জলের গভীরতা : প্রবাল বেড়ে ওঠার জন্য সঠিক মাত্রায় সূর্যালোক ও অক্সিজেন পাওয়ার জন্য 200-250 ফুট গভীর জলের প্রয়োজন।

পলিমুক্ত জল : প্রবাল বেড়ে ওঠার সমুদ্রের মোহনা থেকে দূরে পলিমুক্ত জলের প্রয়োজন।

সমুদ্রস্রোত : প্রবাল কীটের খাদ্য সরবরাহের জন্য সমুদ্রস্রোত প্রধান ভূমিকা পালন করে।

এছাড়া অন্তসাগরীয় মঞ্চের অবস্থান, কম লবণতাযুক্ত জল, প্রবাল প্রাচীর গঠনের পক্ষে আদর্শ।

 

FAQ :                                                                                           

১। সম্মুখ তটভূমি ও পশ্চাদ তটভূমির মধ্যে পার্থক্য কী?

জোয়রের জলের উচ্চতম জলসীমা থেকে ভাটার সময় নিম্নতম জলসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকাকে সম্মুখ তটভূমি বলে। 

ঝটিকা তরঙ্গের জলের ঊর্ধ্বসীমা থেকে ভৃগুতটের পাদদেশ পর্যন্ত অঞ্চলকে বলা হয় পশ্চাদ তটভূমি।

২। সমুদ্রতরঙ্গের কোন অংশ পশ্চাদ তটভূমি নামে পরিচিত?

সমুদ্র জলতলের উচ্চসীমা থেকে ভৃগুতটের পাশাপাশি পাদদেশ পর্যন্ত অঞ্চলকে বলা হয় পশ্চাদ তটভূমি।

৩। সমুদ্র তটরেখার ভৃগুর উৎপত্তির প্রধান কারণ কী?

সমুদ্রের দিক বরাবর শিলাস্তরের নতি ঢালের বিন্যাস, শিথিল শিলাখণ্ডের স্তরায়ন তল বরাবর অবস্থান।

৪। স্পীট কী?

এক প্রান্ত স্থলভাগের সঙ্গে যুক্ত ও সম্মুখ প্রান্ত সমুদ্রে অভিক্ষিপ্ত বাঁধকে স্পীট বলে। যেমন : চিল্কা হ্রদের সামনে 50 কিমি দীর্ঘ স্পীট।

৫। টম্বোলো গঠিত হয় কোন সঞ্চয়ের ফলে?

সমুদ্রতরঙ্গের সঞ্চয়কার্যের ফলে।

৬। সমুদ্রের উন্মুক্ত অংশের দৈর্ঘ্য কী নামে পরিচিত?

ফেচ।

৭। ভারতের কোন উপকূল উত্থিত উপকূলের অন্তর্গত?

করমণ্ডল উপকূল।

৮। ফিয়র্ড উপকূল ইউরোপের কোন অঞ্চলে দেখা যায়?

নরওয়ে উপকূলে।

৯। প্রবাল প্রাচীর কাকে বলে?

কোনো দেশে বা বৃহৎ দ্বীপের চর্তুদিকে বিচ্ছিন্ন বা অবিচ্ছিন্নভাবে বেষ্টন করে থাকা মৃত প্রবালের আবরণগুলি দ্বারা সঞ্চিত দীর্ঘ অপ্রশস্ত ভূভাগকে প্রবাল প্রাচীর বলে। যেমন : অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট বেরিয়ার রিফ।