জলনির্গম প্রণালী বা নদী নকশা গড়ে ওঠার কারণ :

ভূ­নিম্নস্থ গঠন : ভূনিম্নস্থ গঠন বলতে বোঝায় অববাহিকার শিলাস্তরের সজ্জা, শিলাস্তরের ক্ষয় প্রতিরোধী ক্ষমতার তারতম্য, শিলাস্তরের দারণ, ফাটল ও চ্যুতির অবস্থা, শিলাস্তরের আয়াম ও নতি, শিলাস্তরের প্রবেশ্যতা ও সছিদ্রতা। এই উপাদানগুলি কিভাবে জলনির্গম প্রণালীর উপর প্রভাব বিস্তার করে তা আলোচিত হল

ক) শিলাস্তরের সজ্জা : ভূনিম্নস্থ শিলাস্তরের সজ্জা অনুভূমিক, উল্লম্ব, একনত, ভাঁজযুক্ত ইত্যাদি প্রকার হতে পারে এবং এগুলির উপরই নদীর গতি প্রকৃতি অনেকাংশে নির্ভর করে।

যেমন — একনত গঠনযুক্ত শিলাস্তরে জাফরীরূপী জলনির্গম প্রণালী এবং গম্বুজ গঠনের শিলাস্তরে কেন্দ্রবিমুখ জলনির্গম প্রণালীর সৃষ্টি হয়।

শিলাস্তরের ক্ষয় প্রতিরোধী ক্ষমতার তারতম্য : নদী অববাহিকার সর্বত্র একই শিলাস্তর থাকে না, কোথাও কোমল, কোথাও কঠিন বা ক্ষয় প্রতিরোধী শিলাস্তর। নদী সর্বদা কোমল শিলাকে অনুসরণ করে এবং তার ফলে নির্দিষ্ট ধরনের জলনির্গম প্রণালী গড়ে ওঠে।

শিলাস্তরে দারণ, ফাটল ও চ্যুতির অবস্থা : শিলাস্তরে দারণ, ফাটল ও চ্যুতি নদীর গতিপথকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে। গতিপথের কোনো অংশে চ্যুতি, দারণ ইত্যাদি থাকলে নদী সরাসরি সেই দুর্বল অংশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়। এজন্য স্বাভাবিক অবস্থায় নদীর গতিপথে যে বাঁক সৃষ্টি হয়, চ্যুতি, ফাটলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হলে তা আর থাকে না ফলে বিশেষ ধরনের জলনির্গম প্রণালীর সৃষ্টি হয়।

শিলাস্তরের আয়াম ও নতি : নদী সৃষ্টির সম্ভাবনা শিলাস্তরের আয়াম ও নতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এজন্য কোনো কোনো অববাহিকার নতি বরাবর নদী এবং আয়াম বরাবর উপত্যকা সৃষ্টি হয় এবং তার ফলে নদী নকশাও বিশেষ প্রকৃতির হয়।

শিলাস্তরের প্রবেশ্যতা ও সছিদ্রতা : নদী নকশা সৃষ্টিতে এটির সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও ভূপৃষ্ঠ প্রবাহ বাড়া­কমা অর্থাৎ পরোক্ষভাবে এর প্রভাব লক্ষ করা যায়। যেমন : সছিদ্রতা যত বাড়ে এবং প্রবেশ্যতা যত কমে অববাহিকায় নদীর সংখ্যাও তত বাড়ে এবং এর ফলে নদী নকশার প্রকৃতিও প্রভাবিত হয়।

ভূমির প্রারম্ভিক ঢাল : ভূ­আলোড়নের মাধ্যমে উত্থিত ভূমিভাগের প্রাথমিক ঢাল অনুসারে যে নদী প্রবাহিত হয় তাকে বলে অনুগামী নদী। পরবর্তী সময়ে ক্ষয়চক্রের দ্বিতীয় বা তৃতীয় পর্যায়ে ওই ভূমিভাগের উপর যে নদী নকশা সৃষ্টি হয় তার উপর আগের সেই অনুগামী নদীরও কিছুটা প্রভাব থাকে। তাই নদী নকশা সৃষ্টিতে ভূমির প্রারম্ভিক ঢালের ভূমিকা আছে।

  

জলনির্গম প্রণালীর প্রধান নিয়ন্ত্রকসমূহ :

ভূতত্ত্ব, ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুর ভিত্তিতে কোনো নদী অববাহিকায় একটি নদী গোষ্ঠীর অন্তর্গত প্রধান নদী, উপনদী, শাখানদী, সম্মিলিতভাবে যে বিশেষ নকশা বা জ্যামিতিক আকৃতির সৃষ্টি করে, তাকে নদী নকশা বা জলনির্গম প্রণালী বলে।

জলনির্গম প্রণালীর নিয়ন্ত্রকসমূহ :

) ভূতাত্ত্বিক গঠন :

শিলাস্তরের বিন্যাস : নদী অববাহিকায় কঠিন ও নরম শিলার সজ্জার ওপর নদীনকশার গঠন নির্ভর করে। উন্মুক্ত কঠিন ও কোমল শিলা পরপর থাকলে নদী কঠিন শিলা এড়িয়ে নরম শিলাস্তরের ওপর দিয়ে ঢালের দিকে বয়ে সমান্তরাল বিন্যাস গঠন করে। ভূপৃষ্ঠের সঙ্গে অনুভূমিক শিলাগঠন হলে বৃক্ষরূপী নকশা গড়ে ওঠে।

শিলাস্তরের কাঠিন্য : শিলাস্তরে দুর্বল শিলাকে নদী দ্রুত ক্ষয় করে তার উপত্যকা গঠন করে। তাই গম্বুজাকার ভূগঠনে অঙ্গুরীয় বিন্যাস দেখা যায়। সেখানে কঠিন শিলাকে নদী কম ক্ষয় করে। তেমনই জাফরিরূপী বিন্যাসে কঠিন শিলাকে এড়িয়ে পরবর্তী নদী বয়ে চলে।

শিলাস্তরের আয়াম ও নতি : নদীপথের দিক, নদীসঙ্গম অববাহিকার শিলাস্তরের নতি ও আয়ামের বিন্যাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। জাফরিরূপী বিন্যাসে অনুগামী ও গৌণ অনুগামী নদীর পথ নতির দিকে, বিপরা নদীতে নতির বিপরীতে এবং পরবর্তী নদীতে আয়ামের দিকে বিস্তৃত হয়ে নদীসঙ্গমগুলি সমকৌণিক রূপ নেয়।

শিলার ফাটল, দারণ, চ্যুতি : শিলাস্তরের ফাটল, দারণ, চ্যুতি সমকৌণিক হলে আয়তকার নদীসঙ্গম সৃষ্টি হয়। হেরিংবোন নকশাতে চ্যুতিরেখা বরাবর নদীপথ সরলরৈখিক হয়।

শিলার সচ্ছিদ্রতা ও প্রবেশ্যতা : অববাহিকার সমধর্মী শিলাস্তরের প্রবেশ্যতা যত কমে, সচ্ছিদ্রতা তত বাড়ে, নদ­নদীর সংখ্যাও তত বাড়ে। ফলে বৃক্ষরূপী জলনির্গম প্রণালী গড়ে ওঠে।

ভূগঠন : গম্বুজাকার বা উর্দ্ধভঙ্গ গঠনে কেন্দ্র বিমুখ, বেসিন বা অধোভঙ্গের ভূগঠনে কেন্দ্রমুখী, একনত ভাঁজগঠিত ভূভাগে জাফরিরূপী নদীবিন্যাস গড়ে ওঠে।

ভূপ্রকৃতি :  প্রারম্ভিক ভূমিঢাল : আবহবিকার প্রাথমিক ভূমিঢাল যে দিকে থাকে তাকেই অনুসরণ করে প্রধান বা অনুগামী নদী প্রবাহিত হয়।

ভূমিঢালের প্রকৃতি : i) খাড়া ভূমিঢালে দ্রুতগামী পরস্পর সমান্তরাল নদী নকশার একটি কেন্দ্রীয় অংশ থেকে বাইরের দিকে কেন্দ্রবহির্মুখী; ii) বাইরে থেকে ভেতরের দিকে ভূমিঢাল হলে কেন্দ্রমুখী; iii) মৃদুঢালে বিনুনীরূপী নদীনকশা গঠিত হয়।

ভূমিরূপ : শুষ্ক ও গম্বুজ আকৃতির পাহাড়, আগ্নেয়শঙ্কু, ক্যালডেরা গঠনের ভূমিরূপকে অনুসরণ করে অনুরূপ জলনির্গম প্রণালী গড়ে ওঠে।

আবহাওয়া ও জলবায়ু : বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, বাষ্পীভবন প্রভৃতিও নদী নকশার গঠনকে প্রভাবিত করে, বেশি বৃষ্ঠিযুক্ত অঞ্চলে জাফরিরূপী, সমান্তরাল বৃক্ষরূপী জলনির্গম প্রণালী গড়ে ওঠে।

ভূমির আলোড়ন : ভূ­আলোড়নে ফাটল, চ্যুতি, ঢাল পরিবর্তন ঘটে, নদীনকশাতেও বৈচিত্র্য আসে।

বৃক্ষরূপী জলনির্গম প্রণালী ও জাফরিরূপী জলনির্গম প্রণালীর মধ্যে পার্থক্য :

বিষয়

বৃক্ষরূপী জলনির্গম প্রণালী

জাফরিরূপী জলনির্গম প্রণালী

নামকরণ গ্রিক শব্দ Dendron (গাছ) থেকে Dendritic শব্দের উৎপত্তি ইংরেজি Trellis শব্দটির অর্থ গাছে উঠতে সাহায্যকারী কাঠ বা ধাতু নির্মিত দণ্ড বা জাফরি।
অঞ্চল আর্দ্র জলবায়ুর সমান্তরাল শিলাস্তর ও সমসত্ত্ব শিলা গঠিত ভূভাগে এই নদী নকশা গড়ে ওঠে। আর্দ্র জলবায়ুর একণত ও ভাঁজযুক্ত শিলা গঠিত ভূভাগে শিলাস্তরের নতি ও আয়াম অনুসরণ করে এই প্রকার নদী নকশা গড়ে ওঠে।
নদী সঙ্গম এক্ষেত্রে উপনদীগুলি প্রধান নদীর সঙ্গে গাছের ডালপালার মতো বিভিন্ন কোণে মিলিত হয়। এক্ষেত্রে সমগ্র নদী জালিকাতে জাফরির মতো সমকোণী নদী সঙ্গম ঘটে।
নদীর প্রকৃতি এক্ষেত্রে নদী ও উপনদীর সমন্বয় দেখা যায় এক্ষেত্রে অনুগামী পরবর্তী, পুনর্ভবা, বিপরা এই চার প্রকার নদী থাকে।
নদীর বাঁক এক্ষেত্রে উপনদীগুলি সূক্ষ্মকোণে।  উভয় দিক থেকে এসে প্রধান নদীতে ও শাখানদীগুলি <90° কোণে প্রধান নদী থেকে বের হয়। এক্ষেত্রে নদীগুলি আঁকাবাঁকা হয়, কিন্তু প্রধান নদীর সাথে উপনদীগুলি সমকোণে (90°) এসে মিলিত হয়।
ভূগঠন এই জলনির্গম প্রণালী ভূগাঠনিক সম্পর্কহীন, এর উপর ভূগঠনের বিশেষ নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এটি একনত ঢালু ও ভাঁজপ্রাপ্ত ভূগঠনে গড়ে ওঠে।

 

কেন্দ্রবিমুখ জলনির্গম প্রণালী ও কেন্দ্রমুখী জলনির্গম প্রণালীর পার্থক্য : 

অঙ্গুরীয় জলনির্গম প্রণালী ও হেরিং বোন আকৃতির জলনির্গম প্রণালী সম্পর্কে যা জান লেখো।

গম্বুজাকৃতি ভূমিরূপের দুর্বল শিলাস্তরকে অনুসরণ করে গম্বুজটির চারপাশে কেন্দ্রবিমুখ ছোটো ছোটো নদী আংটির মতো গোলাকৃতি পথে নীচের দিকে প্রবাহিত হয়ে যে নদী নকশা গড়ে ওঠে তাকে অঙ্গুরীয় জলনির্গম প্রণালী বলে।

বৈশিষ্ট্য : এই জলনির্গম প্রণালী একটি গম্বুজাকৃতি উচ্চভূমিতে যদি পরপর কঠিন­কোমল শিলা গঠন থাকে তাহলে বৈষম্যমূলক ক্ষয়ের ফলে চক্রাকারে কয়েকটি অসমান ধাপ সৃষ্টি হয়। অপেক্ষাকৃত বড়ো নদীগুলি ওই ধাপ অবলম্বন করে গম্বুজটির চারপাশে গোল গোল আংটির মতো আকার নিয়ে প্রবাহিত হয়। আর কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থিত গম্বুজটি থেকে উৎপন্ন নদীগুলি ছোটো ছোটো কেন্দ্রবিমুখ আংটির মতো প্রবাহিত মূল নদীর উপনদী হিসাবে মিলিত হয়। নরম শিলায় প্রবাহিত পরবর্তী নদী মস্তক ক্ষয়ের মাধ্যমে অনুগামী নদীকে গ্রাস করে।

উদাহরণ : ভারতের ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগ মালভূমিতে দামোদরের উপনদীতে দেখা যায়।

হেরিংবোন আকৃতির জলনির্গম প্রণালী : পার্বত্য ও পাহাড়ি অঞ্চলে যেখানে মূল নদী গভীর উপত্যকার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়, সেখানে উপত্যকার উভয় দিকের খাড়াই ঢাল বেয়ে বহু ছোটো ছোটো নদী বয়ে এসে মূল নদীতে মেলে। এরফলে হেরিং মাছের কাঁটার আকারে যে নদী নকশা গড়ে ওঠে তাকে হেরিংবোন জলনির্গম প্রণালী বলে। মানুষের বুকের পাঁজরের সাথে মিল থাকায় একে পাঁজর রূপী জলনির্গম প্রণালীও বলা হয়।

বৈশিষ্ট্য : এই নদীবিন্যাসে প্রধান নদী প্রায় সরলরেখায় প্রবাহিত হয় এবং উপনদীগুলি প্রায় সরলরেখায় প্রবাহিত হয়ে এসে প্রধান নদীতে পড়ে। এই নদী বিন্যাসে দুই পাশের উপনদীগুলি পরস্পরের মুখোমুখি এসে প্রধান নদীতে পড়ে। এই জলনির্গম প্রণালীতে উপনদীগুলি প্রধান নদীতে প্রায় সমকোণে এসে পতিত হয়।

উদাহরণ : কাশ্মীরের ঝিলাম নদী ও ঘর্ঘরার উপনদীগুলি নদীর উর্ধ্বপ্রবাহে কোশির উপনদী তামার কোশিতে এই নদী নকশা দেখা যায়।

আয়তক্ষেত্ররূপী জলনির্গম প্রণালী,  পুনর্ভবা ও বিপরা নদী  এবং পিনেট জলনির্গম প্রণালী :

যে জলনির্গম প্রণালীতে প্রধান নদী ও তাদের উপনদীগুলি প্রায় সমকোণে এসে মিলিত হয়ে আয়তকার রূপ নেয় তাকে আয়তকার জলনির্গম প্রণালী বলে।

বৈশিষ্ট্য : মধ্যম বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে এই জলনির্গম প্রণালী গড়ে ওঠে। এই প্রকার নদী বিন্যাসে উপনদীগুলি অপেক্ষাকৃত কাছে কাছে এবং প্র­উপনদীগুলি দূরে দূরে অবস্থান করে। এই জলনির্গম প্রণালীতে উপনদীগুলি প্রধান নদীর সঙ্গে সমকোণে বা সূক্ষ্মকোণে মিলিত হয়। দারণ, চ্যুতি, জোড় ফাটল ইত্যাদি দুর্বল ভূগাঠনিক স্থান দিয়ে নদীগুলি প্রবাহিত হয়। নদীর ঘনত্ব বেশ কম।

উদাহরণ : মধ্যভারতের বেতোয়া, শোন নদী অববাহিকা, অন্ধ্রের কুডাপ্পা অঞ্চল, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাডিনডাক পর্বত, নরওয়ের উপকূল, আফ্রিকার জাম্বেসি গিরিখাত অঞ্চলে এই জলনির্গম প্রণালী গড়ে উঠেছে।

বিপরা নদী : অনুগামী নদী যেদিকে প্রবাহিত হয় তার বিপরীতে অর্থাৎ সমগ্র অববাহিকার ঢালের বিপরীত দিকে প্রবাহিত নদীকে বলে বিপরা নদী। একে বিপরীত অনুগামী নদীও বলে। প্রবাহ অঞ্চলে শিলাস্তরের নতির বিপরীত হলে একে বিপরীত নতি নদী, ভৃগুতটের স্থানীয় ঢালে প্রবাহিত হলে ভৃগুতট নদীও বলে।

পুনর্ভবা নদী : মূল অনুগামী নদীর বিপরীতে প্রবাহিত নদী হল পুনর্ভবা নদী, এই নদী স্থানীয় ঢাল অনুসারে প্রবাহিত হয়। পুনর্ভবা ও বিপরা নদী পরবর্তী নদীতে উভয়দিক থেকে এসে মিলিত হয়। বহুক্ষেত্রে এই নদীর হদিশ পাওয়া যায় না। ভূ­উত্থানের ফলে পূর্বেকার ভূমিভাগের বহু চিহ্ন নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

পিনেট জলনির্গম প্রণালী : বৃক্ষরূপী জলনির্গম প্রণালীর এক বিশেষ রূপ হল পিনেট জলনির্গম প্রণালী। অসন্নিবদ্ধ শিলাগঠিত  অঞ্চলে প্রধান নদী গভীর ও  সংকীর্ণ উপত্যকা সৃষ্টি করলে এবং উপত্যকার দুদিক খাড়া ঢালযুক্ত হলে ঘনভাবে অসংখ্য ছোটো ছোটো নদী প্রধান নদীতে মিলিত হয়ে পালকের মতো আকৃতি বিশিষ্ট হয়। একে পিনেট জলনির্গম প্রণালী বলে।

ইংরেজি Pinnate — যৌগিক পাতা।

বৈশিষ্ট্য : বহু সংখ্যক উপনদী সূক্ষ্মকোণে মিলিত হয়। মূল নদীর দুপাশ থেকে খুব ছোটো দৈর্ঘ্যের নদী এসে মিলিত হয়। একটি যৌগিক পাতায় যেমন উপশিরা বা পালকে ডাঁটির দুপাশে ছোটো ছোটো রোঁয়ার মতো থাকে এই নদী নকশা তেমনই দেখতে হয়।

উদাহরণ : ভারতে হিমালয়ের দক্ষিণপ্রান্তে তরাই অঞ্চল নর্মদা, কম্বল নদী অববাহিকা, যুক্তরাষ্ট্রে কলোরাডো মালভূমির বেসিন ও রেঞ্জ অঞ্চলে এই নকশা দেখা যায়।

সমান্তরাল ও আয়তকার নদী নকশা বা জল নির্গম প্রণালী :

সমান্তরাল নদী নকশা : পর্বত বা মালভূমির প্রান্তদেশে, কিংবা কোনো অববাহিকার ঢালু অংশ বেয়ে অসংখ্য ছোটো ছোটো নদী পরস্পরের সমান্তরালে প্রবাহিত হলে যে নদী নকশা গড়ে ওঠে তাকে সমান্তরাল নদী নকশা বলে।

উদাহরণ : হাজারিবাগ মালভূমি, শিবালিকের দক্ষিণ ঢালে, পশ্চিম ঘাটের পশ্চিম ঢালে এই নদী নকশা দেখা যায়।

ভূগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক : সমান্তরাল সংস্র থাকলে ওই সংস্র বরাবর নদী প্রবাহিত হয়ে এই নদী নকশার সৃষ্টি করে। হিমবাহের গ্রাবরেখা গঠিত অঞ্চলে  সমান্তরাল পার্শ্ব গ্রাবরেখা বরাবর সমান্তরাল নদী নকশা গড়ে ওঠে।

আয়তাকার নদী নকশা : প্রধান নদী ও তার উপনদী  সমূহ সমকোণে বাঁক নিয়ে প্রবাহিত হলে যে নদী নকশার সৃষ্টি হয় তাকে আয়তাকার নদী নকশা বলে। 

উদাহরণ : আরাবল্লি পর্বতের পশ্চিমাংশ, ইউরোপের নরওয়ে উপকূলে এই নদী নকশা দেখা যায়।

ভূ­গঠনের সঙ্গে সম্পর্ক : শিলাস্তরের গঠনে অসংখ্য দারণ বা সংস্রের উপস্থিতি  থাকা প্রয়োজন। সমকোণে বা সূক্ষকোণে পরস্পর মিলিত দারণ ও সংস্র গঠিত অঞ্চলে এই নদী নকশা গড়ে ওঠে।

  

জাফরিরূপী নদীনকশার বৈশিষ্ট্য :

জাফরিরূপী নদী নকশার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি হল —

a) ভূগঠন : জাফরিরূপী নদীনকশা একনত ভূগঠন অঞ্চলে গড়ে ওঠে। এক্ষেত্রে শিলাস্তরগুলি একই দিকে এবং একই পার্শ্বে হেলে থাকে।

b) নদী নকশা গঠন : জাফরিরূপী নদীনকশা চার ধরনের নদী দ্বারা গঠিত। যথা: অনুগামী নদী, গৌণ অনুগামী নদী, বিনতি নদী এবং আয়াম নদী।

c) ভূ­গঠন : একনত ভূ­গঠন অঞ্চলে প্রধান ভূমিরূপ হল ভৃগু এবং উপত্যকা। আর এই ভূমিভাগের ওপরই জাফরিরূপী নদীনকশা গড়ে ওঠে।

d) মূলনদী ও উপনদী : জাফরিরূপী নদীনকশায় অনুগামী নদী হল মূল নদী। আর উপনদী হল আয়াম নদী, গৌণ অনুগামী নদী ও বিনতি নদী।

বৃক্ষরূপী নদীনকশা ও তার বৈশিষ্ট্য :

ভূমিঢালের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যে নদী জালিকায় মূল নদীর সঙ্গে তার উপনদীগুলি সূক্ষ্ম কোণে মিলিত হয় এবং ডালপালা যুক্ত একটি গাছের আকার ধারণ করে তাকে বৃক্ষরূপী নদীনকশা বলে।

উদাহরণ : ছোটোনাগপুর মালভূমি অঞ্চলে বৃক্ষরূপী নদীনকশা দেখা যায়।

বৈশিষ্ট্য : বৃক্ষরূপী জলনির্গম প্রণালীর মূল বৈশিষ্ট্যগুলি হল—

a) ভূগঠন : বৃক্ষরূপী নদীনকশার উদ্ভব ও বণ্টনের ক্ষেত্রে ভূগঠনের বিশেষ নিয়ন্ত্রণ নেই। বস্তুত সমধর্মী অনুভূমিক শিলাগঠিত অঞ্চলে বৃক্ষরূপী নদীনকশা গড়ে ওঠে। এই ধরনের ভূগঠন ভূমিরূপ ও ভূ­ঢালকে প্রভাবিত করে না।

b) ভূমিঢাল : বৃক্ষরূপী নদীনকশাকে ভূমিঢাল বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। ভূমির ঢাল যেদিকে নদীগুলিও সেদিকে প্রবাহিত হয়।

c) নদীসংগম : বৃক্ষরূপী নদীনকশায় মূলনদীর সঙ্গে উপনদীগুলি সূক্ষ্মকোণে মিলিত হয়। একইভাবে বড়ো উপনদীর সঙ্গে ছোটো ছোটো উপনদী সূক্ষ্মকোণে মিলিত হয়।

  

জলনির্গম প্রণালীর সাথে তার নিম্নস্থ ভূতাত্ত্বিক গঠনের সম্পর্ক :

জলনির্গম প্রণালীর সাথে তার নিম্নস্থ ভূতাত্ত্বিক গঠনের সম্পর্ক নিম্নে বিশদভাবে আলোচনা করলাম —

i) শিলাস্তরের সজ্জা : ভূনিম্নস্থিত শিলাস্তরের সজ্জা অনুভূমিকভাবে উল্লম্ব, একনত, ভাঁজযুক্ত ইত্যাদি প্রকার হতে পারে এবং এগুলির ওপরই নদীর গতিপ্রকৃতির বহুলাংশ নির্ভর করে। যেমন : একনত গঠনযুক্ত শিলাস্তরে এবং গম্বুজ গঠনের শিলস্তরে জাফরিরূপী ও কেন্দ্রবিমুখ জলনির্গম প্রণালীর সৃষ্টি হয়।

ii) শিলাস্তরের ক্ষয় প্রতিরোধী ক্ষমতার তারতম্য : নদী অববাহিকার সর্বত্র একই রকম শিলা থাকে না। কোথাও কোমল আবার কোথাও কঠিন বা ক্ষয় প্রতিরোধী শিলাস্তর। নদী সব সময় কোমল বা কম ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতাযুক্ত শিলাকে অনুসরণ করে। তার ফলে নির্দিষ্ট ধরনের জলনির্গম প্রণালী গড়ে ওঠে।

iii) শিলাস্তরে দারণ, ফাটল ও চ্যুতির অবস্থা : শিলাস্তরে দারন, ফাটল ও চ্যুতি নদীর গতিপথকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে। গতিপথের কোনো অংশ চ্যুতি ও দারণ ইত্যাদি থাকলে নদী সরাসরি সেই দুর্বল অংশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়। এজন্য স্বাভাবিক অবস্থায় নদীর গতিপথে যে সব বাঁক সৃষ্টি হয়, চ্যুতি, ফাটল বা দারণের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হলে তা আর থাকে না। এর ফলে বিশেষ ধরনের জলনির্গম প্রণালীর সৃষ্টি হয়।

iv) শিলাস্তরের আয়াম ও নতি : নদী সৃষ্টির সম্ভাবনা বহুলাংশে শিলাস্তরের আয়াম ও নতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এজন্য কোনো কোনো অববাহিকার নতি বরাবর নদী এবং আয়াম বরাবর উপত্যকা সৃষ্টি হয় এবং তার ফলে নদী নকশাও বিশেষ প্রকৃতির হয়।

কেন্দ্রবিমুখ জলনির্গম প্রণালী ও তার সৃষ্টির কারণ :

কোনো গম্বুজাকৃতির পর্বত বা উচ্চভূমি বা শঙ্কু আকৃতির পাহাড়ের চারপাশের ঢাল বেয়ে ছোটো ছোটো নদী বাইরে দিকে প্রবাহিত হলে যে নদী নকশা তৈরি হয়, তাকে Radial Drainage pattern বলে।

গড়ে ওঠার কারণ : এইরূপে জলনির্গম প্রণালী গড়ে ওঠার মূল কারণ হল — কোনো গম্বুজাকৃতি ভূমিরূপ, যে গম্বুজের কেন্দ্র হতে শিলাস্তরের নতি চতুর্দিকে নেমে যায়, এইরূপ অঞ্চলে নদীগুলি কেন্দ্রীয় অংশ হতে উৎপত্তি লাভ করে।

চতুর্দিকে শিলার নিম্ন নতি বরাবর প্রবাহিত হয় এবং কেন্দ্রবিমুখ জলনির্গম প্রণালীর সৃষ্টি করে।

উদাহরণ : রাঁচি মালভূমির উপর পশ্চিম হইতে পূর্বে বিস্তৃত গম্বুজাকৃতি পাহাড়ে কেন্দ্রবিমুখ জলনির্গম প্রণলী সুন্দর দেখতে পাওয়া যায়। শ্রীলঙ্কা এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

FAQ : 

১। নদীনকশা কাকে বলে?

একটি নদী অববাহিকার মধ্যে প্রধান নদী, তার উপনদী, শাখা নদীগুলি সম্মিলিতভাবে যে বিশেষ ধরনের নকশা বা জ্যামিতিক আকৃতি গঠন করে তাকে নদীনকশা বা জলনির্গম প্রণালী বলে।

২। জলনির্গম প্রণালীর দুটি বৈশিষ্ট্য লেখো।

শিলাগঠনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণতা : শিলাগঠনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জল নির্গম প্রণালী গড়ে ওঠে। 

নদীগুলোর সম্মিলিত রূপ : নদী অববাহিকার মধ্যে সৃষ্ট সবরকম নদী সম্মিলিতভাবে জলনির্গম প্রণালী গড়ে তোলে। 

৩। ভূনিম্নস্থ গঠনের সঙ্গে সমান্তরাল নদীগোষ্ঠীর সম্পর্ক কী?

i) কোনো স্থানে পরস্পর সমান্তরাল কয়েকটি চ্যুতি অবস্থান করলে ওই সব চ্যুতিরেখা বরাবর নদী প্রবাহিত হলে সমান্তরাল নদীগোষ্ঠী গড়ে ওঠে।

ii) মালভূমির খাড়া ঢাল বরাবর প্রবাহিত নদীগুলো না এঁকেবেঁকে সমান্তরালভাবে সোজাসুজি নীচের দিকে নেমে আসে এবং সমান্তরাল নদীগোষ্ঠী গড়ে ওঠে।

৪। বিনুনীরূপী  জলনির্গম প্রণালী কাকে বলে?

মধ্য ও নিম্নগতিতে ভূমির ঢাল কমে যায় বলে খাতের মধ্যে দিয়ে নদী এঁকেবেঁকে একবার শাখা প্রশাখায় ভাগ হয়, আবার মিলিত হয়, আবার ভাগ ও মিলিত হয়। এইভাবে যে নদী নকশার সৃষ্টি হয় তাকে বিনুনীরূপী জলনির্গম প্রণালী বলে।

৫। Trillis কথাটির বাংলা প্রতিশব্দ কী?

Trillis কথাটির বাংলা প্রতিশব্দ হল জাফরি।

৬। কাশ্মীর উপত্যকার ঝিলাম নদীতে কী ধরনের জলনির্গম প্রণালী গড়ে উঠেছে?

হেরিংবোন সদৃশ জলনির্গম প্রণালী।     

৭। কোন জলনির্গম প্রণালী পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়?

পৃথিবীতে বৃক্ষরূপী জলনির্গম প্রণালী সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।